পোস্টগুলি

বৃদ্ধ বাবা-মা কখনো হঠাৎ বৃদ্ধ হয় না।

 সব সন্তানই একদিন বাবা-মা হয় না। কিন্তু সব সন্তানই কোনো না কোনোদিন সন্তান ছিল। এই কথাটা খুব সহজ। এত সহজ যে মানুষ এই কথার ভেতরের কষ্টটা বুঝতে পারে না। সহজ কথা মানুষ সাধারণত গুরুত্ব দেয় না। কঠিন কথা শুনলে মাথা নাড়ে, সহজ কথা শুনলে হাই তোলে। আমাদের পাশের বাসায় এক ভদ্রলোক থাকতেন। নাম মতিউর রহমান। আমরা ডাকতাম মতিন সাহেব। মানুষটা খুব সাধারণ। এত সাধারণ যে তাকে দেখলে মনে হতো আল্লাহ পৃথিবীতে কিছু মানুষ বানিয়েছেন শুধু ভিড় পূরণ করার জন্য। অফিসে যেতেন, ফিরতেন, বাজার করতেন, ছেলের জন্য কমলা কিনতেন, মেয়ের জন্য ফিতা কিনতেন, স্ত্রীর জন্য মাঝে মাঝে কাঁচা মরিচ বেশি আনতেন। কারণ তার স্ত্রী ঝাল খেতে ভালোবাসতেন। মতিন সাহেবের একটা ছেলে ছিল। নাম রাফি। ছেলেকে তিনি খুব ভালোবাসতেন। ভালোবাসা বলতে আমরা যা বুঝি, তার চেয়েও বেশি কিছু। নিজের জন্য নতুন পাঞ্জাবি না কিনে ছেলের জন্য জুতা কিনে আনা, দুপুরে অফিসের ক্যান্টিনে মাছ না খেয়ে টাকা জমিয়ে ছেলের কোচিং ফি দেওয়া, শীতের রাতে নিজের কম্বলটা অর্ধেক গায়ে দিয়ে বাকি অর্ধেক ছেলের গায়ে টেনে দেওয়া—এইসব ছোট ছোট ব্যাপার। ছোট ব্যাপারগুলোই আসলে বড়। বড় ব্যাপ...

“বাবা, আমাকে রেখে চলে যাচ্ছ?”

 মসজিদে যাওয়ার সময় মেয়ে আমার, পেছন থেকে ডাক দিয়ে বলে, “বাবা, আমাকে রেখে চলে যাচ্ছ?” হৃদয় আমার হাহাকার করে ওঠে, বলে ওঠে— একদিন তুমিও, সাজ্জাদ, ছেড়ে চলে যাবে; পেছনে রেখে যাবে সবাইকে, সবকিছুকে।

শিশুদের প্রতি ক্রমবর্ধমান নিগ্রহ ও হত্যাকাণ্ড: এক অসুস্থ সমাজের নিঃশব্দ আত্মকথা

  ভূমিকা: রাত যত গভীর হয়, শিশুর কান্না তত স্পষ্ট শোনা যায় রাতের শহরগুলো আজকাল অদ্ভুত নীরব। কোথাও একটা মেয়ে শিশু হয়তো রান্নাঘরের কোণে দাঁড়িয়ে আছে। হাতের চামড়া পুড়ে গেছে গরম খুন্তির ছ্যাঁকায়। কোথাও একটি কিশোরী বাবার হাত আঁকড়ে বাঁচতে চাইছে। কোথাও কোনো স্কুলছাত্রী অন্ধকার গলিতে পড়ে আছে রক্তাক্ত অবস্থায়। আর কোথাও একজন মা থানায় যেতে ভয় পাচ্ছেন—কারণ সমাজ তার পাশে দাঁড়াবে কি না, সেটি নিশ্চিত নয়। এগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন সংবাদ নয়। এগুলো একটি সমাজের মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে শিশু ও নারী নির্যাতনের ঘটনা এমন এক ভয়ংকর মাত্রায় পৌঁছেছে, যেখানে সহিংসতা আর ব্যতিক্রম নয়; বরং ধীরে ধীরে সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মাত্র ১০ মাসেই নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রায় ১৯ হাজার মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। সংখ্যাগুলো কাগজে লেখা থাকে। কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে থাকে একটি ভাঙা শৈশব, একটি আতঙ্কিত মুখ, একটি থমকে যাওয়া জীবন।   শিশু নির্যাতন: যখন ঘরই হয়ে ওঠে কারাগার একসময় বলা হতো, “ঘরই শিশুর নিরাপদ আশ্রয়।” আজ সেই বাক্যটি উচ্চারণ করতেও ভয় লাগে। সম্প্রতি প্রক...

বিচার বিভাগের মর্যাদা

 বাংলাদেশের বিচার বিভাগ আজ এক সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। এই সংকট দৃশ্যমান নয় সবসময়, কিন্তু এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। কারণ বিচার বিভাগ কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়—এটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের ভিত্তি, নাগরিকের শেষ আশ্রয়স্থল, এবং গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। এই সংকটের শিকড়ও একেবারে নতুন নয়। সাবেক প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান তাঁর আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন যে, এরশাদের শাসনামলে তৎকালীন যশোর বা বরিশাল সার্কিট বেঞ্চের এক বিচারপতিকে একটি মাজারের অভ্যর্থনা বইয়ে মন্তব্য লেখাকে কেন্দ্র করে অপসারণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ বিচার বিভাগের ওপর অপ্রাতিষ্ঠানিক বা অযৌক্তিক হস্তক্ষেপের নজির অতীতেও রয়েছে। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের ১/১১-এর সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অভিযোগের ভিত্তিতে কিছু বিচারপতিকে অপসারণ বা কার্যত সরিয়ে দেওয়া হয়। আবার আওয়ামী লীগ সরকারের সময়, বিশেষ করে সাবেক প্রধান বিচারপতি এস. কে. সিনহাকে ঘিরে ঘটনাপ্রবাহ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করে। এসব ঘটনায় একটি ধারা স্পষ্ট—সময়ের সাথে সাথে বিচার বিভাগের ওপর চাপ প্রয়োগের পদ্ধতি বদলালেও প্র...

হাসপাতালের করিডরে কান্না, শিশুর চোখে জ্বরের আগুন: হামে কাঁপছে বাংলাদেশ

হাসপাতালের করিডরে কান্না, শিশুর চোখে জ্বরের আগুন: হামে কাঁপছে বাংলাদেশ বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে এখন এক ভয়াবহ দৃশ্য। শিশু ওয়ার্ডের সামনে লম্বা লাইন, মায়ের কাঁধে জ্বরাক্রান্ত শিশু, বাবার চোখে আতঙ্ক, করিডরে কান্নার শব্দ—আর চিকিৎসকদের মুখে ক্লান্তির ছাপ। দেশের বহু মানুষ ভেবেছিল হাম শুধু পুরোনো দিনের রোগ, টিকার যুগে এটি ইতিহাস হয়ে গেছে। কিন্তু সেই ইতিহাসই যেন আজ ফিরে এসেছে মৃত্যুর দূত হয়ে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে আরও পাঁচ শিশু। এ নিয়ে নিশ্চিত মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩০ জন, আর সন্দেহজনক মৃত্যু বেড়ে হয়েছে ১৫৬। একই দিনে নতুন শনাক্ত হয়েছে ৮২ জন রোগী। দেশে নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ৭২১ জনে পৌঁছেছে। এ সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়—প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার, একটি ভাঙা ঘর, একটি থেমে যাওয়া ভবিষ্যৎ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ এখন হামের আগুনে দেশের সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি চাঁপাইনবাবগঞ্জে। স্থানীয় এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারাদেশের প্রায় ১০ শতাংশ হামের রোগী এখন এই একটি জেলায় । ভাবুন একবার—একটি জেল...

ব্যাংক রেজুল্যুশন আইনের আড়ালে পুরোনো লুটেরাদের পুনর্বাসন?-সাজ্জাদ আলী চৌধুরী

  ব্যাংক রেজুল্যুশন আইনের আড়ালে পুরোনো লুটেরাদের পুনর্বাসন? বাংলাদেশের ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, খেলাপি ঋণ, অর্থপাচার ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে গভীর সংকটে নিমজ্জিত। এই সংকট মোকাবিলায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে ব্যাংক রেজুল্যুশন অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল, তার মূল লক্ষ্য ছিল—দুর্বল ও বিপর্যস্ত ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন করা এবং যারা এসব ব্যাংক ধ্বংসের জন্য দায়ী, তাদের মালিকানা থেকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে দেওয়া। কিন্তু সদ্য পাস হওয়া ব্যাংক রেজুল্যুশন আইন, ২০২৬ সেই উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। নতুন আইনের ১৮(ক) ধারা অনুযায়ী, রেজুল্যুশন প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যাংকের আগের শেয়ারহোল্ডার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবেচনায় “উপযুক্ত” ব্যক্তি আবারও সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় গ্রহণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। আরও বিস্ময়কর হলো—সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিনিয়োগকৃত অর্থের মাত্র ৭.৫ শতাংশ জমা দিয়েই মালিকানা ফিরে পাওয়ার পথ খুলে দেওয়া হয়েছে। বাকি ৯২.৫ শতাংশ দুই বছরে ১০ শতাংশ সরল সুদে পরিশোধ করলেই চলবে। প্রশ্ন হলো—যারা বছরের পর বছর ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়ে গেছে...

নিঝরে স্বপ্নভঙ্গ: জুলাই সনদ

 সময়টা যেন অদ্ভুত এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, কোনো এক নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে, কিন্তু এর পরিণতি কী হবে তা কেউই কল্পনা করতে পারছিল না। হঠাৎ করেই আন্দোলন মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিল। মানুষের সম্পৃক্ততা, আত্মত্যাগ আর আগুনঝরা সাহস এক নতুন শক্তির জন্ম দিল। কোথাও যদি ক্লান্তি বা হতাশা এসে ভর করত, তখনই কেউ না কেউ সামনে এসে সাহস জুগিয়েছে। নির্যাতনে ক্লান্ত মানুষগুলো যেন আবার জীবন বাজি রেখে পথে নামার প্রেরণা পেয়েছিল। এভাবেই রচিত হলো ফ্যাসিবাদে পরিণত হওয়া শেখ হাসিনা সরকারের বিদায়ের গল্প। কিন্তু এরপরই সামনে এলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—দেশের হাল ধরবে কে? দেশের নেতৃত্ব যে কেউ নিতে পারে, কিন্তু জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষাপটে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু এই সরকারের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে শুরু থেকেই নানা বিতর্ক ছিল। কেউ একে সময়ের দাবি হিসেবে দেখেছেন, কেউবা প্রশ্ন তুলেছেন এর সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়ে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে—জুলাই আন্দোলন কি সত্যিই একটি বিপ্লব, নাকি এটি ছিল কেবল একটি গণআন্দোলন? এই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিকভাবে অত্যন্...