ব্যাংক রেজুল্যুশন আইনের আড়ালে পুরোনো লুটেরাদের পুনর্বাসন?-সাজ্জাদ আলী চৌধুরী
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
ব্যাংক রেজুল্যুশন আইনের আড়ালে পুরোনো লুটেরাদের পুনর্বাসন?
বাংলাদেশের ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, খেলাপি ঋণ, অর্থপাচার ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে গভীর সংকটে নিমজ্জিত। এই সংকট মোকাবিলায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে ব্যাংক রেজুল্যুশন অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল, তার মূল লক্ষ্য ছিল—দুর্বল ও বিপর্যস্ত ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন করা এবং যারা এসব ব্যাংক ধ্বংসের জন্য দায়ী, তাদের মালিকানা থেকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে দেওয়া। কিন্তু সদ্য পাস হওয়া ব্যাংক রেজুল্যুশন আইন, ২০২৬ সেই উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
নতুন আইনের ১৮(ক) ধারা অনুযায়ী, রেজুল্যুশন প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যাংকের আগের শেয়ারহোল্ডার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবেচনায় “উপযুক্ত” ব্যক্তি আবারও সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় গ্রহণের জন্য আবেদন করতে পারবেন। আরও বিস্ময়কর হলো—সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিনিয়োগকৃত অর্থের মাত্র ৭.৫ শতাংশ জমা দিয়েই মালিকানা ফিরে পাওয়ার পথ খুলে দেওয়া হয়েছে। বাকি ৯২.৫ শতাংশ দুই বছরে ১০ শতাংশ সরল সুদে পরিশোধ করলেই চলবে।
প্রশ্ন হলো—যারা বছরের পর বছর ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়ে গেছে, খেলাপি ঋণ তৈরি করেছে, আমানতকারীদের আস্থা ধ্বংস করেছে, তাদের জন্য এত সহজ শর্তে পুনরায় মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ কেন?
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ২৩টি ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ইসলামী ধারার ৮টি ব্যাংকের ঘাটতিই ১ লাখ ৭৫ হাজার ৮২২ কোটি টাকা। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ঘাটতি ৬৫ হাজার কোটি টাকার বেশি, ইউনিয়ন ব্যাংকের ২৭ হাজার কোটি টাকার বেশি, এক্সিম ব্যাংকের ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি।
এই ব্যাংকগুলোর অনেকগুলোর নাম অতীতে এস আলম গ্রুপসহ বিতর্কিত গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে জড়িত ছিল। সংসদে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের শীর্ষ ২০ খেলাপি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১টিই এস আলম গ্রুপের।
অর্থাৎ, যাদের হাতে ব্যাংক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, নতুন আইন কার্যত তাদেরই ফেরার রাস্তা প্রশস্ত করছে। এটি শুধু নীতিগতভাবে ভুল নয়, অর্থনৈতিকভাবেও বিপজ্জনক।
কারণ ব্যাংক খাতের মূল ভিত্তি হলো আস্থা। আমানতকারী বিশ্বাস করেন বলেই ব্যাংকে টাকা রাখেন। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে লুটপাট, বেনামি ঋণ, অনিয়ম ও অর্থপাচারের অভিযোগ রয়েছে, তাদের আবারও নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনলে সাধারণ গ্রাহক কেন ব্যাংকে আস্থা রাখবেন?
সরকার বলছে, এটি বাজারভিত্তিক সমাধান; রাষ্ট্রের ওপর আর্থিক চাপ কমানোর উপায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো—রাষ্ট্র ইতোমধ্যে একীভূত পাঁচ ব্যাংককে বাঁচাতে ২০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। আমানত বীমা তহবিল থেকেও হাজার হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ জনগণের টাকায় ব্যাংক বাঁচিয়ে আবার সেই ব্যাংক পুরোনো মালিকদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
এটি সংস্কার নয়, বরং ব্যর্থতার পুরস্কার।
যদি সত্যিই ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হয়, তবে প্রথম কাজ হওয়া উচিত ছিল—দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা, লুট করা অর্থ উদ্ধার করা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যাংক পরিচালনা করা। কিন্তু নতুন আইন উল্টো বার্তা দিচ্ছে—ক্ষমতা থাকলে ব্যাংক লুট করো, পরে সামান্য কিস্তিতে আবার মালিকানা ফিরে পাবে।
এভাবে চলতে থাকলে ব্যাংক খাতের সংকট আরও গভীর হবে, আমানতকারীদের আতঙ্ক বাড়বে, এবং অর্থনীতির ভিত আরও দুর্বল হবে।
ব্যাংক খাত কোনো ব্যক্তিগোষ্ঠীর ব্যবসায়িক খেলাঘর নয়। এটি জনগণের সঞ্চয়, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ভিত্তি। সেই ভিত্তি যারা নষ্ট করেছে, তাদের হাতে আবার চাবি তুলে দেওয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছাড়া আর কিছু নয়।
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন