বৃদ্ধ বাবা-মা কখনো হঠাৎ বৃদ্ধ হয় না।
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
সব সন্তানই একদিন বাবা-মা হয় না।
কিন্তু সব সন্তানই কোনো না কোনোদিন সন্তান ছিল।
এই কথাটা খুব সহজ। এত সহজ যে মানুষ এই কথার ভেতরের কষ্টটা বুঝতে পারে না। সহজ কথা মানুষ সাধারণত গুরুত্ব দেয় না। কঠিন কথা শুনলে মাথা নাড়ে, সহজ কথা শুনলে হাই তোলে।
আমাদের পাশের বাসায় এক ভদ্রলোক থাকতেন। নাম মতিউর রহমান। আমরা ডাকতাম মতিন সাহেব। মানুষটা খুব সাধারণ। এত সাধারণ যে তাকে দেখলে মনে হতো আল্লাহ পৃথিবীতে কিছু মানুষ বানিয়েছেন শুধু ভিড় পূরণ করার জন্য। অফিসে যেতেন, ফিরতেন, বাজার করতেন, ছেলের জন্য কমলা কিনতেন, মেয়ের জন্য ফিতা কিনতেন, স্ত্রীর জন্য মাঝে মাঝে কাঁচা মরিচ বেশি আনতেন। কারণ তার স্ত্রী ঝাল খেতে ভালোবাসতেন।
মতিন সাহেবের একটা ছেলে ছিল। নাম রাফি।
ছেলেকে তিনি খুব ভালোবাসতেন। ভালোবাসা বলতে আমরা যা বুঝি, তার চেয়েও বেশি কিছু। নিজের জন্য নতুন পাঞ্জাবি না কিনে ছেলের জন্য জুতা কিনে আনা, দুপুরে অফিসের ক্যান্টিনে মাছ না খেয়ে টাকা জমিয়ে ছেলের কোচিং ফি দেওয়া, শীতের রাতে নিজের কম্বলটা অর্ধেক গায়ে দিয়ে বাকি অর্ধেক ছেলের গায়ে টেনে দেওয়া—এইসব ছোট ছোট ব্যাপার।
ছোট ব্যাপারগুলোই আসলে বড়।
বড় ব্যাপার মানুষের চোখে পড়ে, ছোট ব্যাপার বুকের ভেতরে জমে থাকে।
রাফি ছোটবেলায় খুব অসুস্থ ছিল। রাতের পর রাত মতিন সাহেব ঘুমাননি। ছেলের কপালে হাত দিয়ে বসে থাকতেন। জ্বর কমছে কি না দেখতেন। ডাক্তার বলেছিল, “চিন্তার কিছু নেই।”
ডাক্তারের এই কথাটা পৃথিবীর সবচেয়ে মিথ্যা কথাগুলোর একটি।
যে বাবা সন্তানের মাথার কাছে বসে থাকে, তার কাছে চিন্তার বাইরে আর কিছু থাকে না। তার ভাতের চিন্তা নেই, ঘুমের চিন্তা নেই, চাকরির চিন্তা নেই। শুধু একটাই চিন্তা—এই ছোট মানুষটা নিঃশ্বাস নিচ্ছে তো?
রাফি বড় হলো। খুব ভালো ছাত্র হলো। বিদেশ গেল। বড় চাকরি পেল। মতিন সাহেব গর্বে ফুলে উঠলেন না। তিনি ফুলে ওঠার মানুষ ছিলেন না। তিনি শুধু চুপচাপ হাসতেন। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলতেন,
“আমার পোলাডা ভালো আছে।”
এই “ভালো আছে” কথাটার মধ্যে তার নিজের সারাজীবনের পুরস্কার ছিল।
তারপর একদিন রাফি দেশে ফিরল। সঙ্গে তার স্ত্রী। স্ত্রী আধুনিক মেয়ে। বাংলা ঠিকমতো বলতে পারে না, তবে ইংরেজিতে খুব সুন্দর করে বলে—
“Dad, you should be practical.”
বৃদ্ধ বাবা practical হওয়ার চেষ্টা করলেন।
Practical মানে হলো, নিজের ঘর ছেড়ে ছোট ঘরে যাওয়া।
Practical মানে হলো, নিজের কথা কম বলা।
Practical মানে হলো, ছেলে ব্যস্ত থাকলে মন খারাপ না করা।
Practical মানে হলো, নাতির সামনে কাশি চাপা দেওয়া।
Practical মানে হলো, একদিন বুঝে ফেলা—এই বাড়িতে তিনি অতিথি। খুব পুরনো অতিথি। এমন অতিথি যাকে বিদায় দিতে সবার একটু লজ্জা লাগে, কিন্তু বিদায় দিলেই সবাই স্বস্তি পায়।
মতিন সাহেব একদিন বারান্দায় বসে ছিলেন। বিকেল। আকাশে মেঘ। মেঘের রং ছিল পুরনো খবরের কাগজের মতো।
রাফি এসে বলল,
“আব্বা, একটা কথা ছিল।”
বাবারা জানেন, “একটা কথা ছিল” মানে সাধারণত ভালো কথা না।
মতিন সাহেব বললেন,
“বল।”
“আপনাকে একটা ভালো জায়গায় রাখার কথা ভাবছি।”
“ভালো জায়গা?”
“হ্যাঁ। সিনিয়র সিটিজেন হোম। খুব ভালো। ডাক্তার আছে, নার্স আছে, আপনার বয়সী মানুষ আছে। আপনার একা লাগবে না।”
মতিন সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন,
“আমার একা লাগে না রে।”
রাফি বিরক্ত হলো।
“আব্বা, আপনি ইমোশনাল হচ্ছেন। জীবনটা practical হতে হয়।”
মতিন সাহেব মাথা নাড়লেন।
“হ্যাঁ। ঠিক বলছিস।”
এই “ঠিক বলছিস” কথাটার মধ্যে কোনো সম্মতি ছিল না। ছিল পরাজয়।
বাবারা খুব নীরবে পরাজিত হন। যুদ্ধ ঘোষণা করেন না। পতাকা নামান না। শুধু একদিন চুপ করে যান।
মানুষ ভাবে বাবা-মা সন্তানকে বড় করে। কথাটা পুরো সত্য না।
অনেক বাবা-মা সন্তানকে বড় করতে করতে নিজেদের ছোট করে ফেলেন।
এত ছোট যে একসময় তাদের আর দেখা যায় না।
তারা নিজেদের যৌবন দেয়, ঘুম দেয়, ক্ষুধা দেয়, ইচ্ছা দেয়। নিজের বাবা-মার কাছে না যেতে পারার অপরাধবোধ দেয়। ভাইবোনের সঙ্গে দূরত্ব দেয়। নিজের ক্যারিয়ারের স্বপ্ন দেয়। কখনও কখনও সততাও দিয়ে ফেলে।
একজন বাবা ভাবে, “এইটুকু অনিয়ম করলাম ছেলের ভবিষ্যতের জন্য।”
একজন মা ভাবে, “এইটুকু মিথ্যা বললাম মেয়ের ভালো থাকার জন্য।”
তারা ভুলে যায়, কোনো সম্পদ আসলে মানুষের নিজের নয়। মানুষ শুধু পাহারাদার। আজ যে জমির দলিল বুকের কাছে চেপে ধরে আছে, কাল সেই জমির ওপর অন্য কারও পায়ের শব্দ হবে। আজ যে টাকার হিসাব করে সন্তানের নামে রাখছে, কাল সেই সন্তানই হয়তো হিসাব করবে—বৃদ্ধ মানুষটার পেছনে মাসে কত খরচ।
প্রকৃতি বড় অদ্ভুত।
মানুষের আদালতে অনেক বিচার হয় না।
কিন্তু প্রকৃতির আদালত বন্ধ থাকে না।
প্রকৃতি কোর্ট বসায় না। উকিল ডাকে না। সাক্ষী আনে না।
সে শুধু সময় দেয়।
তারপর একদিন আয়না ধরিয়ে দেয়।
যে ছেলে বাবাকে ভুলে যায়, সে একদিন নিজের সন্তানের মুখে নিজের ভাষা শুনে।
যে মেয়ে মাকে বোঝা ভাবে, সে একদিন নিজের মেয়ের চোখে বিরক্তি দেখে।
যে মানুষ ভাবে, “বুড়ো মানুষদের এত আবেগ কেন?”—সে একদিন নিজের কাঁপা হাতে পানির গ্লাস ধরতে গিয়ে বোঝে, আবেগ আসলে দুর্বলতা না, আবেগই শেষ আশ্রয়।
আমি একবার একটা মাছের গল্প শুনেছিলাম। সত্যি কি মিথ্যা জানি না। গল্পটা এমন—এক ধরনের মাছ আছে, যার বাচ্চারা মায়ের বা বাবার পেটের ভেতরে থাকে। তারা বড় হতে হতে সেই পেটের ভেতর থেকেই বাবা-মাকে খেতে থাকে। খেয়ে খেয়ে একসময় বাবা বা মা মাছটা মরে যায়। তারপর বাচ্চারা বেরিয়ে আসে।
গল্পটা শুনে আমার খুব খারাপ লেগেছিল।
পরে ভাবলাম, এ তো শুধু মাছের গল্প না।
এ মানুষেরও গল্প।
অনেক সন্তান বাবা-মায়ের পেট থেকে বেরিয়ে আসে না, কিন্তু বাবা-মায়ের বুক থেকে বেরিয়ে আসে।
তারা বাবার ঘুম খায়।
মায়ের যৌবন খায়।
বাবার সঞ্চয় খায়।
মায়ের গোপন কান্না খায়।
তারপর একদিন বড় হয়ে বলে,
“তোমরা আমাদের জন্য কী করেছ?”
এই কথাটা পৃথিবীর সবচেয়ে নিষ্ঠুর কথাগুলোর একটি।
কারণ বাবা-মায়ের করা কাজগুলো দেখা যায় না।
দেখা যায় বাড়ি, গাড়ি, ডিগ্রি, চাকরি।
দেখা যায় না রাত তিনটার জ্বরের পাশে বসে থাকা মানুষটা।
দেখা যায় না ভাঙা স্যান্ডেল পরে অফিসে যাওয়া বাবা।
দেখা যায় না নিজের শখের শাড়ি না কিনে মেয়ের পরীক্ষার ফি দেওয়া মা।
দেখা যায় না সন্তানের মুখে ভাত তুলে দিয়ে নিজের ক্ষুধা লুকানো মানুষ।
আমরা বড় হয়ে সব হিসাব শিখি।
শুধু এই হিসাবটা শিখি না।
একজন বৃদ্ধ বাবা একদিন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকে। ছেলে অফিসে যাচ্ছে। বাবা বলে,
“আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরিস?”
ছেলে বলে,
“সময় নেই আব্বা।”
এই “সময় নেই” কথাটা খুব বিচিত্র।
যার জন্য জীবনভর সময় খরচ করা হলো, তারই সময় নেই।
মা ফোন করে।
“বাবা, খেয়েছিস?”
ছেলে বিরক্ত হয়।
“এই প্রশ্ন প্রতিদিন করতে হয়?”
মা চুপ করে যায়। তারপর বলে,
“না রে, এমনি করলাম।”
মায়েরা “এমনি” বলে অনেক বড় কথা ঢেকে রাখে।
প্রকৃতির বিচার খুব ধীরে হয়।
এত ধীরে যে মানুষ ভাবে বিচার হচ্ছে না।
কিন্তু বিচার হয়।
যে বাবা-মা সন্তানকে মানুষ করতে গিয়ে নিজের অস্তিত্ব পুড়িয়ে ফেলেন, তারা সব সময় প্রতিদান চান না। বাবা-মা আসলে খুব সামান্য চায়।
একটু খবর।
একটু সম্মান।
একটু পাশে বসা।
একদিন বলা—
“তোমরা কষ্ট করেছ।”
এইটুকু।
কিন্তু এইটুকুও অনেক সন্তান দিতে পারে না। কারণ তারা বড় হয়েছে, কিন্তু মানুষ হয়নি।
সব সন্তানই সন্তান হয়।
কিন্তু সব সন্তান মানুষ হয় না।
আর সব বাবা-মা বাবা-মা হতে পারে না, এটাও সত্য। কেউ কেউ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়। কেউ সন্তানকে ভালোবাসার নামে শাসন করে, কেউ স্বপ্নের নামে বোঝা চাপায়, কেউ নিজের অপূর্ণতা সন্তানের ঘাড়ে বসিয়ে দেয়। জীবন একপাশা গল্প না। সব বাবা-মা দেবতা না। সব সন্তান অকৃতজ্ঞ না।
তবু একটা কথা থেকে যায়।
যে মানুষ তোমাকে একদিন অসহায় অবস্থায় কোলে তুলেছিল, তার হাত একদিন কাঁপলে সেই হাতটা ধরা খুব বড় কাজ না।
যে মানুষ তোমার কান্না বুঝত ভাষা শেখার আগেই, তার নীরবতা বোঝা খুব কঠিন হওয়ার কথা না।
বৃদ্ধ বাবা-মা কখনো হঠাৎ বৃদ্ধ হয় না।
তারা ধীরে ধীরে বৃদ্ধ হয়—সন্তানের ব্যস্ততার ফাঁকে, ফোন না ধরার মধ্যে, উৎসবের দিনে একা বসে থাকার মধ্যে, দরজার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে।
তারপর একদিন তারা আর থাকে না।
সেদিন সন্তানরা আসে। ফুল আনে। কান্না করে। মানুষ ডাকে। বলে,
“আমার বাবা খুব ভালো মানুষ ছিলেন।”
“আমার মা আমার জন্য অনেক কষ্ট করেছেন।”
মৃত মানুষরা এসব শুনতে পায় কি না জানি না।
তবে বেঁচে থাকতে বললে হয়তো তারা একটু হাসতেন।
সেই হাসিটুকুই ছিল তাদের প্রাপ্য।
আমরা সেটুকুও অনেক সময় দিতে পারি না।
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন