শিশুদের প্রতি ক্রমবর্ধমান নিগ্রহ ও হত্যাকাণ্ড: এক অসুস্থ সমাজের নিঃশব্দ আত্মকথা

 


ভূমিকা: রাত যত গভীর হয়, শিশুর কান্না তত স্পষ্ট শোনা যায়

রাতের শহরগুলো আজকাল অদ্ভুত নীরব।

কোথাও একটা মেয়ে শিশু হয়তো রান্নাঘরের কোণে দাঁড়িয়ে আছে। হাতের চামড়া পুড়ে গেছে গরম খুন্তির ছ্যাঁকায়। কোথাও একটি কিশোরী বাবার হাত আঁকড়ে বাঁচতে চাইছে। কোথাও কোনো স্কুলছাত্রী অন্ধকার গলিতে পড়ে আছে রক্তাক্ত অবস্থায়। আর কোথাও একজন মা থানায় যেতে ভয় পাচ্ছেন—কারণ সমাজ তার পাশে দাঁড়াবে কি না, সেটি নিশ্চিত নয়।

এগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন সংবাদ নয়।

এগুলো একটি সমাজের মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ।

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে শিশু ও নারী নির্যাতনের ঘটনা এমন এক ভয়ংকর মাত্রায় পৌঁছেছে, যেখানে সহিংসতা আর ব্যতিক্রম নয়; বরং ধীরে ধীরে সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মাত্র ১০ মাসেই নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রায় ১৯ হাজার মামলা রেকর্ড করা হয়েছে।

সংখ্যাগুলো কাগজে লেখা থাকে।

কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে থাকে একটি ভাঙা শৈশব, একটি আতঙ্কিত মুখ, একটি থমকে যাওয়া জীবন।

 

শিশু নির্যাতন: যখন ঘরই হয়ে ওঠে কারাগার

একসময় বলা হতো, “ঘরই শিশুর নিরাপদ আশ্রয়।”

আজ সেই বাক্যটি উচ্চারণ করতেও ভয় লাগে।

সম্প্রতি প্রকাশিত একাধিক ঘটনায় দেখা গেছে, শিশুরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে পরিবার, আত্মীয়স্বজন কিংবা পরিচিত মানুষের হাতে। এগুলো কোনো অপরিচিত অন্ধকার জগতের গল্প নয়। বরং পরিচিত ঘরের ভেতরের নৈঃশব্দ্যের গল্প।

বিমানের সাবেক এমডি শফিকুর রহমানের বাসায় ১১ বছরের এক গৃহকর্মীকে দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের অভিযোগ উঠে। শিশুটির শরীরে গরম খুন্তির ছ্যাঁকার দাগ, আঘাতের চিহ্ন এবং মানসিক ট্রমার বর্ণনা উঠে এসেছে মামলার বিবরণে।

শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তখনও নাকি ঠিকমতো কথা বলার শক্তি ছিল না তার। এই দৃশ্য কেবল আইনের ব্যর্থতা নয়; এটি মানুষের ভেতরের মানবিক মৃত্যুর প্রমাণ।

একটি সমাজ যখন শিশুকে শ্রমিক বানায়, তখন সে সমাজ প্রথমে শিশুর শৈশব হত্যা করে।

তারপর ধীরে ধীরে শিশুটিকেও।

 

ধর্ষণ, হত্যা ও ক্ষমতার ছায়া

নরসিংদীর ঘটনাটি পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।

এক কিশোরীকে বাবার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। অভিযোগ ওঠে, স্থানীয় প্রভাবশালীরাও ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—এই অপরাধগুলো হঠাৎ ঘটে না।

এগুলো ধীরে ধীরে তৈরি হয়।

যখন সমাজে অপরাধী রাজনৈতিক আশ্রয় পায়,

যখন ভুক্তভোগী পরিবার মামলা করতে ভয় পায়,

যখন “সমঝোতা” নামের সামাজিক বিষ ছড়িয়ে পড়ে—

তখন ধর্ষক আরও সাহসী হয়ে ওঠে।

এ কারণেই দেখা যায়, একবার ধর্ষণের পর আবার অপহরণ, তারপর হত্যা। কারণ অপরাধীরা বিশ্বাস করতে শেখে যে, তাদের কিছুই হবে না।

এখানেই সমাজের নৈতিক মৃত্যু শুরু হয়।

 

মানসিক অসুস্থতা: আমরা কি অসুস্থ মানুষ তৈরি করছি?

প্রতিটি হত্যাকারী জন্মগত খুনি নয়।

তবে প্রতিটি খুনির পেছনে থাকে এক দীর্ঘ মানসিক অবক্ষয়ের ইতিহাস।

হাজারীবাগে স্কুলছাত্রী বিন্তি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত সিয়াম জানিয়েছিল, সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহ ও ক্ষোভ থেকেই সে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল।

এখানে প্রশ্ন হলো—

একজন তরুণ কেন প্রত্যাখ্যানকে সহ্য করতে পারে না?

কারণ আমাদের সমাজ এখনো সন্তানদের শেখায় না কিভাবে মানসিক আঘাত সামলাতে হয়।

শেখায় না আবেগ নিয়ন্ত্রণ।

শেখায় না নারীর স্বাধীনতাকে সম্মান করতে।

বরং ছোটবেলা থেকেই ছেলেদের মধ্যে একধরনের মালিকানাবোধ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।

“সে আমার।”

“আমাকে না বলবে কেন?”

“আমি না পেলে অন্য কেউও পাবে না।”

এই অসুস্থ পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা একসময় সহিংসতায় রূপ নেয়।

 

সাইবার সহিংসতা: নতুন যুগের অদৃশ্য নির্যাতন

বর্তমান সমাজে নির্যাতন কেবল শারীরিক নয়।

মানুষ এখন মোবাইল ফোন দিয়েও মানুষ হত্যা করতে পারে।

প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতা দ্রুত বাড়ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিভিন্ন জরিপে। নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে ভুয়া তথ্য ছড়ানো, ব্যক্তিগত ছবি প্রকাশ, ব্ল্যাকমেইল, অনলাইন হয়রানি—এসব এখন ভয়াবহ মাত্রা পেয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শেহরীন আমিন ভূঁইয়া (মোনামী) হত্যার হুমকি পেয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে অপমান ও ভয় দেখানোর ঘটনাও সামনে এসেছে।

এগুলো কেবল ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়।

এগুলো পুরো সমাজকে ভয় দেখানোর কৌশল।

 

বিশ্বব্যাপী নৈতিক অবক্ষয়: এপস্টেইনের ভয়ংকর প্রতীক

জেফরি এপস্টেইনের ঘটনা শুধু আমেরিকার কোনো অপরাধকাহিনি নয়।

এটি আধুনিক সভ্যতার গভীর অসুস্থতার প্রতীক।

তার বিরুদ্ধে শিশু যৌন নিপীড়ন, পাচার এবং ক্ষমতা ব্যবহার করে ভয়ংকর অপরাধ সংগঠনের অভিযোগ বহুদিন ধরেই ছিল। এমনকি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নিজের শুক্রাণু ব্যবহার করে “শিশু প্রজনন খামার” তৈরির পরিকল্পনাও করেছিলেন তিনি।

এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—

শুধু দরিদ্র সমাজ নয়, তথাকথিত উন্নত সভ্যতাও ভয়াবহ নৈতিক সংকটে আক্রান্ত।

অর্থ, ক্ষমতা ও বিকৃত যৌন মানসিকতা যখন একসঙ্গে মিশে যায়, তখন মানুষ মানুষ থাকে না।

সে একধরনের নিয়ন্ত্রণপিপাসু দানবে পরিণত হয়।

 

কেন বাড়ছে এই সহিংসতা?

১. পরিবারে মানবিক শিক্ষার সংকট

আজকের পরিবারে সন্তানের সঙ্গে কথোপকথন কমে গেছে।

মোবাইল ফোন বেড়েছে, কিন্তু সম্পর্ক কমেছে।

২. ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার দুর্বলতা

নৈতিকতা এখন পরীক্ষার বিষয় নয়। ফলে মানুষ শিক্ষিত হচ্ছে, কিন্তু বিবেকবান হচ্ছে না।

৩. সহিংস বিনোদনের প্রভাব

নিয়মিত সহিংস কনটেন্ট দেখার ফলে মানুষের সংবেদনশীলতা কমে যাচ্ছে।

৪. বিচারহীনতার সংস্কৃতি

অনেক অপরাধই ধামাচাপা পড়ে যায়। ফলে অপরাধীরা সাহস পায়।

৫. রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব

ক্ষমতাবানদের ছত্রছায়া অপরাধকে নিরাপদ করে তোলে।

 

শিশুরা কেন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?

কারণ শিশুরা প্রতিবাদ করতে জানে না।

তারা ভয় পায়।

তারা নির্ভরশীল।

একটি শিশু যখন নির্যাতনের শিকার হয়, তখন সে কেবল শারীরিকভাবে আহত হয় না; তার মস্তিষ্ক, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, শৈশবের ট্রমা অনেক সময় ভবিষ্যতের সহিংস আচরণের জন্ম দেয়। অর্থাৎ, আজ যে শিশু নির্যাতিত হচ্ছে, সঠিক সহায়তা না পেলে আগামীকাল সে-ই আবার সহিংস হয়ে উঠতে পারে।

এই কারণেই শিশু নির্যাতন কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি জাতীয় সংকট।

 

নারী ও শিশুর নিরাপত্তা কি কেবল স্লোগান?

রাজনৈতিক বক্তব্যে নারী নিরাপত্তার কথা প্রায়ই বলা হয়।

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

একদিকে নারীরা মন্ত্রিসভায় জায়গা পাচ্ছেন, নেতৃত্বে আসছেন।

অন্যদিকে ধর্ষণ, হত্যা, হুমকি ও সাইবার নিপীড়নের ঘটনাও বাড়ছে।

এ যেন এক অদ্ভুত দ্বৈততা।

সমাজ বাহ্যিকভাবে আধুনিক হচ্ছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আরও সহিংস হয়ে উঠছে।

 

সমাধান কোথায়?

আইনের কঠোর প্রয়োগ

শুধু গ্রেপ্তার নয়, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা

স্কুল পর্যায়ে আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সম্পর্ক, সম্মান ও সহমর্মিতা শেখাতে হবে।

পরিবারে সময় দেওয়া

শিশুর সঙ্গে কথা বলতে হবে। তার ভয়, কষ্ট ও পরিবর্তন বুঝতে হবে।

সামাজিক প্রতিরোধ

অপরাধী নিজের মানুষ হলেও তাকে আড়াল করা যাবে না।

সাইবার নিরাপত্তা

অনলাইন হয়রানির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা জরুরি।

 

উপসংহার: আমরা কেমন সমাজ রেখে যাচ্ছি?

একদিন হয়তো ইতিহাস লেখা হবে।

সেখানে লেখা থাকবে—

এই সময়ের মানুষ প্রযুক্তিতে উন্নত হয়েছিল, কিন্তু মানবিকতায় পিছিয়ে পড়েছিল।

শিশুরা খেলনা পেত, কিন্তু নিরাপত্তা পেত না।

মানুষ বড় বড় ভবন বানিয়েছিল, কিন্তু নিরাপদ পরিবার বানাতে পারেনি।

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—

আমরা ধীরে ধীরে সহিংসতার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি।

সংবাদ পড়ে কষ্ট পাই।

তারপর ভুলে যাই।

কিন্তু যে শিশুটি নির্যাতনের শিকার হয়েছে, সে ভুলতে পারে না।

তার রাতগুলো বদলে যায়।

তার পৃথিবী বদলে যায়।

সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন জিডিপি দিয়ে মাপা যায় না।

মাপা যায়—

একটি শিশু কতটা নিরাপদ,

একটি মেয়ে কতটা নির্ভয়ে হাঁটতে পারে,

এবং মানুষ এখনো মানুষ আছে কি না—সেটি দিয়ে।

@Shazzad Ali Chowdhury, Barrister-at-Law, Advocate, Supreme Court of Bangladesh


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

Order VI Rule 16 CPC: Striking Out Pleadings in Bangladesh (and the Subcontinent)

চট্টগ্রামে খোলা ড্রেন ও খাল: অব্যবস্থাপনার দায়ে ১৫টি প্রাণহানি

দেশে-দেশে গণ-অভ্যুত্থান এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বৈষম্যবিরোধী বিপ্লব