নিঝরে স্বপ্নভঙ্গ: জুলাই সনদ
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
সময়টা যেন অদ্ভুত এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, কোনো এক নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে, কিন্তু এর পরিণতি কী হবে তা কেউই কল্পনা করতে পারছিল না। হঠাৎ করেই আন্দোলন মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিল। মানুষের সম্পৃক্ততা, আত্মত্যাগ আর আগুনঝরা সাহস এক নতুন শক্তির জন্ম দিল। কোথাও যদি ক্লান্তি বা হতাশা এসে ভর করত, তখনই কেউ না কেউ সামনে এসে সাহস জুগিয়েছে। নির্যাতনে ক্লান্ত মানুষগুলো যেন আবার জীবন বাজি রেখে পথে নামার প্রেরণা পেয়েছিল। এভাবেই রচিত হলো ফ্যাসিবাদে পরিণত হওয়া শেখ হাসিনা সরকারের বিদায়ের গল্প।
কিন্তু এরপরই সামনে এলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—দেশের হাল ধরবে কে? দেশের নেতৃত্ব যে কেউ নিতে পারে, কিন্তু জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এই প্রেক্ষাপটে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু এই সরকারের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে শুরু থেকেই নানা বিতর্ক ছিল। কেউ একে সময়ের দাবি হিসেবে দেখেছেন, কেউবা প্রশ্ন তুলেছেন এর সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়ে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে—জুলাই আন্দোলন কি সত্যিই একটি বিপ্লব, নাকি এটি ছিল কেবল একটি গণআন্দোলন? এই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আন্দোলনের চরিত্রের ওপরই নির্ভর করে পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থার বৈধতা ও রূপান্তরের পথ।
পরিবর্তনের দাবিতে গঠিত হয় একের পর এক সংস্কার কমিশন। নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, সংবিধান, দুর্নীতি দমনসহ নানা খাতে সংস্কারের জন্য বিভিন্ন কমিশন তৈরি করা হয়। এসব কমিশন অসংখ্য প্রস্তাবও দেয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সক্ষমতা কতটুকু?
এরই ধারাবাহিকতায় প্রকাশিত হয় ‘জুলাই সনদ’ গেজেট। এটিকে বলা হয় এক ধরনের হাইব্রিড গেজেট বা বিশেষ আদেশ। একদিকে সরকার নিজেকে একটি বিপ্লব-উত্তর সরকার হিসেবে উপস্থাপন করে, অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। তবে শর্ত ছিল—এটি পরবর্তীতে সংসদে অনুমোদিত হতে হবে।
জুলাই সনদ প্রকাশের পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নানা ধরনের আপত্তি ও ভিন্নমত জানায়। বিশেষ করে গণভোটের প্রশ্নে তীব্র বিতর্ক দেখা দেয়। গণভোট আদৌ প্রয়োজন কি না, এটি জনগণের মতামত প্রকাশের সঠিক পদ্ধতি কি না, কিংবা এর মাধ্যমে কোনো পক্ষ বিশেষ সুবিধা পাবে কি না—এসব প্রশ্ন সামনে আসে।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এক ধরনের সমঝোতা হয়। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, গণভোট এবং ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন একই দিনে, অর্থাৎ ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত হবে। ফলে দেশ এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়ায়—একই দিনে গণভোটের ফল এবং সাধারণ নির্বাচনের ফল কী বার্তা দেবে, সেটিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
নির্বাচনের আগে বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে। কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে, ১৭ ফেব্রুয়ারি, দলটির পক্ষ থেকে সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ গ্রহণ নিয়ে অনীহা দেখা যায়। এতে রাজনৈতিক অচলাবস্থার আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়।
জুলাই সনদ অনুযায়ী, সংস্কার পরিষদ গঠনের এক মাসের মধ্যে কিছু বাধ্যবাধকতা পূরণ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেলেও সে বিষয়ে আইন স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা দেয়নি। ফলে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি এখন প্রশ্নের মুখে।
এখানে আরও বড় প্রশ্ন হলো—জুলাই সনদ না থাকলে এই সরকারের বৈধতা কোথায় দাঁড়ায়? কারণ পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল ২০২৯ সালে। তাহলে ২০২৬ সালের নির্বাচন কোন ভিত্তিতে হলো? এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না থাকলে রাজনৈতিক সংকট দীর্ঘায়িত হতে পারে।
একই সঙ্গে সন্দেহ তৈরি হয়েছে—জুলাই সনদ আদৌ আলোর মুখ দেখবে কি না, নাকি এটি কেবল রাজনৈতিক সমঝোতার একটি সাময়িক দলিল হয়েই থাকবে।
যদি এর আইনি ভিত্তি দুর্বল হয়, তবে নৈতিক ভিত্তি কতটা শক্তিশালী? রাজনৈতিক দলগুলো কি একে অস্বীকার করতে পারবে? নাকি জনগণের প্রত্যাশা ও আন্দোলনের স্মৃতি একে টিকিয়ে রাখবে?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে। বিপ্লব, গণআন্দোলন কিংবা শাসক পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে, নতুন সনদ বা অন্তর্বর্তী সংবিধান প্রণয়ন হয়েছে। কোথাও তা সফল হয়েছে, কোথাও ব্যর্থ হয়েছে। কোথাও গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়েছে, আবার কোথাও নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। ইতিহাস বলে, রাজনৈতিক ঐকমত্য ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি ছাড়া কোনো পরিবর্তনই দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
বাংলাদেশেও কী হতে পারে, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলোর পরিপক্বতা, জনগণের সচেতনতা এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার ওপর।
সবকিছুর ঊর্ধ্বে দেশ। আমরা এ দেশকে ভালোবাসি। ১৯৪৭, ১৯৭১, ১৯৯০ কিংবা ২০২৪—প্রতিটি সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ এগিয়ে গেছে। নানা সংকট পেরিয়ে দেশ সামনে এগিয়েছে, ভবিষ্যতেও এগিয়ে যাবে। কারণ বাংলাদেশের শক্তি তার মানুষ, আর মানুষের স্বপ্ন কখনো থেমে থাকে না।
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন