হাসপাতালের করিডরে কান্না, শিশুর চোখে জ্বরের আগুন: হামে কাঁপছে বাংলাদেশ

হাসপাতালের করিডরে কান্না, শিশুর চোখে জ্বরের আগুন: হামে কাঁপছে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে এখন এক ভয়াবহ দৃশ্য। শিশু ওয়ার্ডের সামনে লম্বা লাইন, মায়ের কাঁধে জ্বরাক্রান্ত শিশু, বাবার চোখে আতঙ্ক, করিডরে কান্নার শব্দ—আর চিকিৎসকদের মুখে ক্লান্তির ছাপ। দেশের বহু মানুষ ভেবেছিল হাম শুধু পুরোনো দিনের রোগ, টিকার যুগে এটি ইতিহাস হয়ে গেছে। কিন্তু সেই ইতিহাসই যেন আজ ফিরে এসেছে মৃত্যুর দূত হয়ে।

গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে আরও পাঁচ শিশু। এ নিয়ে নিশ্চিত মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩০ জন, আর সন্দেহজনক মৃত্যু বেড়ে হয়েছে ১৫৬। একই দিনে নতুন শনাক্ত হয়েছে ৮২ জন রোগী। দেশে নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ৭২১ জনে পৌঁছেছে।

এ সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়—প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার, একটি ভাঙা ঘর, একটি থেমে যাওয়া ভবিষ্যৎ।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ এখন হামের আগুনে

দেশের সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি চাঁপাইনবাবগঞ্জে। স্থানীয় এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারাদেশের প্রায় ১০ শতাংশ হামের রোগী এখন এই একটি জেলায়

ভাবুন একবার—একটি জেলার হাসপাতালগুলোতে কতটা চাপ পড়েছে! ২৫০ শয্যার হাসপাতাল কার্যত পরিণত হয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে। রোগীর চাপ এতটাই বেড়েছে যে, বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট দূর করতে জরুরি ভিত্তিতে ফিল্টার বসানোর নির্দেশ দিতে হয়েছে।

একজন মা যখন অসুস্থ শিশুকে কোলে নিয়ে হাসপাতালের মেঝেতে বসে থাকেন, তখন রাষ্ট্রের উন্নয়নের গল্প তার কাছে অর্থহীন শোনায়।

কোথায় গেল টিকা কর্মসূচির সাফল্য?

একসময় বাংলাদেশ টিকাদান কর্মসূচিতে বিশ্বের কাছে প্রশংসিত ছিল। গ্রামের বাড়ি থেকে শহরের বস্তি—সর্বত্র পৌঁছে যেত ইপিআই কর্মসূচি। শিশুদের হাম, পোলিও, ডিপথেরিয়া—সবকিছু থেকে রক্ষার ঢাল ছিল টিকা।

কিন্তু আজ সেই ঢাল ভেঙে গেছে।

এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, টিকার জন্য যেখানে প্রয়োজন ছিল ১ হাজার ৩৮ কোটি টাকা, সেখানে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৪৬২ কোটি টাকা।

এটা শুধু বাজেট ঘাটতি নয়—এটা নীতিগত ব্যর্থতা। কারণ টিকা না কেনা মানে ভবিষ্যতের মৃত্যুকে আমন্ত্রণ জানানো।

কেন শিশুরাই বেশি মরছে?

হামের টিকা সাধারণত ৯ মাস বয়সের পর দেওয়া হয়। ফলে ৬ মাস থেকে ৯ মাস বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন ৬ মাস থেকেই টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই সিদ্ধান্ত আগে নেওয়া গেল না কেন?

কেন পরিস্থিতি বিপজ্জনক হওয়ার পর সরকার জেগে উঠল?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কবার্তাও উপেক্ষিত?

এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানুয়ারিতেই হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে সতর্ক করেছিল। কিন্তু যথাসময়ে তা গুরুত্ব পায়নি।

যদি সত্যি হয়ে থাকে, তবে এটি কেবল অবহেলা নয়—এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা।

কারণ সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো সময়মতো পদক্ষেপ

যখন সরকার দেরি করে, তখন ভাইরাস অপেক্ষা করে না।

টিকাবিরোধী গুজবও বড় হুমকি

রাজনৈতিক নেতারাও বলছেন, টিকাবিরোধী অপপ্রচার, কুসংস্কার ও ভুল ধারণার কারণে হামের ঝুঁকি বেড়েছে।

এটি সত্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা গুজব ছড়ায়—টিকা নিলে ক্ষতি হবে, জ্বর হবে, সন্তান অসুস্থ হবে। অথচ সত্য হলো—টিকা না নিলে মৃত্যু হতে পারে।

আজ যারা গুজব ছড়ায়, কাল তাদের কথার মূল্য দেয় একটি শিশুর জীবন।

হাসপাতালে যা দেখা যাচ্ছে

ঢাকা, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ময়মনসিংহ—বিভিন্ন স্থানে শিশু ওয়ার্ডে চাপ বাড়ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, অনেকে দেরিতে হাসপাতালে আসছেন। অনেকে বাড়িতে কবিরাজি, ঝাড়ফুঁক, নিজস্ব ওষুধ দিয়ে সময় নষ্ট করছেন।

ফলে যখন হাসপাতালে আসছেন, তখন শিশুর শরীরে পানি শূন্যতা, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, উচ্চ জ্বর—সব একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে।

হাম অনেকেই সাধারণ রোগ মনে করেন। কিন্তু দুর্বল শিশুর শরীরে এটি মৃত্যু ডেকে আনতে পারে।

দায় কার?

এই প্রশ্ন এখন ঘরে ঘরে।

  • টিকা ঘাটতির দায় কার?

  • স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অদক্ষতার দায় কার?

  • সতর্কবার্তা উপেক্ষার দায় কার?

  • হাসপাতালের প্রস্তুতিহীনতার দায় কার?

  • গুজব ঠেকাতে ব্যর্থতার দায় কার?

যদি কোনো রাষ্ট্র শিশুদের রক্ষা করতে না পারে, তবে তার উন্নয়নের পরিসংখ্যান জনগণের কাছে শূন্য হয়ে যায়।

এখন কী করা জরুরি?

এখন আর দোষারোপের সময় নয়—এখন যুদ্ধের সময়।

জরুরি করণীয়:

  1. সারা দেশে বিশেষ হাম টিকাদান ক্যাম্পেইন

  2. ৬ মাসের বেশি সব ঝুঁকিপূর্ণ শিশুকে দ্রুত টিকা

  3. জেলা হাসপাতালে আলাদা হাম ইউনিট

  4. অক্সিজেন, স্যালাইন, শিশু বিশেষজ্ঞ নিশ্চিত করা

  5. গ্রামে গ্রামে স্বাস্থ্যকর্মী পাঠানো

  6. গুজব দমনে গণমাধ্যম প্রচার

  7. প্রতিদিন জেলা ভিত্তিক তথ্য প্রকাশ

একটি শিশুর কান্না, একটি জাতির ব্যর্থতা

হাসপাতালের বিছানায় যখন জ্বরে পুড়ছে শিশু, তখন রাজনীতি অর্থহীন। যখন মায়ের কোল খালি হয়, তখন বক্তৃতা মূল্যহীন। যখন টিকার অভাবে মৃত্যু হয়, তখন সভ্যতার দাবি মিথ্যা হয়ে যায়।

বাংলাদেশ এখন একটি পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে—আমরা কি শিশুদের বাঁচাতে পারব, নাকি পরিসংখ্যান গুনে গুনে কাঁদব?

হাম কেবল একটি রোগ নয়। এটি রাষ্ট্রের সক্ষমতার পরীক্ষা। এবং এই পরীক্ষায় ফেল করলে মূল্য দিতে হবে পুরো জাতিকে। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

Order VI Rule 16 CPC: Striking Out Pleadings in Bangladesh (and the Subcontinent)

চট্টগ্রামে খোলা ড্রেন ও খাল: অব্যবস্থাপনার দায়ে ১৫টি প্রাণহানি

দেশে-দেশে গণ-অভ্যুত্থান এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বৈষম্যবিরোধী বিপ্লব