বিচার বিভাগের মর্যাদা

 বাংলাদেশের বিচার বিভাগ আজ এক সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। এই সংকট দৃশ্যমান নয় সবসময়, কিন্তু এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। কারণ বিচার বিভাগ কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়—এটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের ভিত্তি, নাগরিকের শেষ আশ্রয়স্থল, এবং গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।

এই সংকটের শিকড়ও একেবারে নতুন নয়। সাবেক প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান তাঁর আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন যে, এরশাদের শাসনামলে তৎকালীন যশোর বা বরিশাল সার্কিট বেঞ্চের এক বিচারপতিকে একটি মাজারের অভ্যর্থনা বইয়ে মন্তব্য লেখাকে কেন্দ্র করে অপসারণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ বিচার বিভাগের ওপর অপ্রাতিষ্ঠানিক বা অযৌক্তিক হস্তক্ষেপের নজির অতীতেও রয়েছে। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের ১/১১-এর সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অভিযোগের ভিত্তিতে কিছু বিচারপতিকে অপসারণ বা কার্যত সরিয়ে দেওয়া হয়। আবার আওয়ামী লীগ সরকারের সময়, বিশেষ করে সাবেক প্রধান বিচারপতি এস. কে. সিনহাকে ঘিরে ঘটনাপ্রবাহ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করে। এসব ঘটনায় একটি ধারা স্পষ্ট—সময়ের সাথে সাথে বিচার বিভাগের ওপর চাপ প্রয়োগের পদ্ধতি বদলালেও প্রবণতাটি কখনো পুরোপুরি বিলীন হয়নি।

এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। জুলাই ২০২৪-এর পূর্বে বিচারপতিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিক্ষোভ, অপসারণের দাবি বা ব্যক্তিগত আক্রমণ ছিল বিরল। কিন্তু এখন তা ক্রমশ সাধারণ চিত্রে পরিণত হচ্ছে। অভিযোগ উঠছে, স্লোগান উঠছে, কিন্তু প্রায়ই অনুপস্থিত থাকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া। ফলে প্রশ্ন জাগে—আমরা কি আইনের শাসনের পথে এগোচ্ছি, নাকি জনমতের চাপকে আইনের বিকল্প হিসেবে দাঁড় করাচ্ছি?

আরও চিন্তার বিষয় হলো—এই পরিস্থিতিতে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার অভাব। আইনজীবী সমাজ, বার, এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী মহল—যারা বিচার বিভাগের স্বাভাবিক রক্ষাকবচ—তাদের ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন ছিল। অন্যদিকে বিচারপতিরা তাঁদের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকাশ্যে নিজেদের পক্ষে কথা বলতে পারেন না। এই বাস্তবতাকে যদি কেউ অপব্যবহার করে, তবে তা বিচার বিভাগের মর্যাদাকে নীরবে ক্ষয় করে।

সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় দেখা গেছে, ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধের বিষয়গুলোও রাস্তায় নিয়ে আসা হচ্ছে। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে বিচারপতিদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সংগঠিত করার ঘটনাও সামনে এসেছে। একইভাবে, আদালতের অভ্যন্তরীণ কিছু কর্মচারীর প্রকাশ্যে মিডিয়ায় এসে অভিযোগ তোলার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। অভিযোগ অবশ্যই করা যাবে—কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেটি কীভাবে করা হবে? সংবিধান এবং আইন কি সে পথ নির্ধারণ করে দেয়নি?

একটি রাষ্ট্রে বিচার বিভাগের মর্যাদা রক্ষা করা মানে কেবল বিচারপতিদের রক্ষা করা নয়; বরং ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়াকে সুরক্ষিত রাখা। যদি বিচার বিভাগ জনমতের তাৎক্ষণিক চাপ, অপপ্রচার বা সংগঠিত প্রচারণার কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়, তবে বিচারিক স্বাধীনতা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তাই এখন প্রয়োজন প্রতিক্রিয়াশীল নয়, বরং গঠনমূলক পদক্ষেপ।সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের মনে রাখতে হবে—বিচার বিভাগ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়; এটি রাষ্ট্রের এবং জনগণের। এখানে সিদ্ধান্ত হবে আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে, চাপ বা প্রচারণার ভিত্তিতে নয়।

বাংলাদেশের ইতিহাস বলে—সংকট এসেছে, আবার উত্তরণও ঘটেছে। বিচার বিভাগও সেই পথেই এগোতে পারে, যদি আমরা প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা, সংবিধান এবং ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির প্রতি অবিচল থাকি।

কারণ, শেষ পর্যন্ত—
বিচার বিভাগের শক্তিই রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

Order VI Rule 16 CPC: Striking Out Pleadings in Bangladesh (and the Subcontinent)

চট্টগ্রামে খোলা ড্রেন ও খাল: অব্যবস্থাপনার দায়ে ১৫টি প্রাণহানি

দেশে-দেশে গণ-অভ্যুত্থান এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বৈষম্যবিরোধী বিপ্লব