লাশ ও আমরা
ফজরের নামাজ শেষে ফেসবুকে একটু টু মারাটা আমার নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
শুধু কি আমার? আমাদের পুরো প্রজন্মটাই এই রোগে ভুগছে।
কোর্টে গেলে দেখি সবাই স্ক্রল করছে। মামলার কাগজপত্র টেবিলে রাখা আছে, আর স্যাররা দিব্যি ফেসবুক স্ক্রল করছেন। ডাক্তারের চেম্বারে গেলেও একই অবস্থা।
তবে শিশু বিশেষজ্ঞ প্রফেসর জাহাঙ্গির আলাদা। উনি কেবল স্টার জলসা দেখেন। একদিন ওনার চেম্বারে গিয়ে দেখি, সামনে রোগীর লাইন জমে আছে, আর উনি কুশলীতে হেসে হেসে সিরিয়ালের মাঝেই চোখ রাখছেন স্টার জলসায়। যেটা আমাদের জন্য অবিশ্বাস্য, ওনার কাছে একেবারেই স্বাভাবিক।
সাইয়ার জন্মের পর তার নাভি পড়তে দেরি হচ্ছিল। আমরা একের পর এক ডাক্তার বদলাচ্ছি, আর প্রতিটি ডাক্তার বলছেন—“খুব চিন্তার বিষয়।” আমার মাথা ঘুরে যায়। কিন্তু জাহাঙ্গির সাহেব সেদিন শান্ত গলায় বললেন—
—টেনশন করবেন না। নাভি নিজেই পড়বে।
—কবে?
—কবে পড়বে সেটা আল্লাহ ভালো জানেন।
অবশেষে পড়লও। টেনশন না করার উপদেশটাই আসলে চিকিৎসা।
ওনার এক মজার বৈশিষ্ট্য আছে। যখন তানিয়া বলে—“ডাক্তার সাহেব, সাইয়ার কিছু খায় না। একেবারে চিকন হয়ে যাচ্ছে”—তখন উনি রেগে যান।
—চিকন হলে কী হয়েছে? মোটা বাচ্চা ভালো লাগে নাকি? ক্ষুধা লাগলে নিজে থেকেই খাবে। নো টেনশন।
এমন বকাবকি শুনে মনে হয়, উনি ডাক্তার নন, ঘরের মানুষ।
সাইয়ার জন্মের সময় ইউনাইটেড হাসপাতালে তিন দিনের ফটো থেরাপির বিল হলো দুই লক্ষ আশি হাজার টাকা। শুনে আমার মাথায় হাত। আমি একজন সাধারণ আইনজীবী। কোর্টে মামলার শুনানি দিয়ে দিনশেষে লড়াই করি, আর ওরা তিন দিনে বিল ধরলো দুই লক্ষ আশি হাজার! তখনকার সব সঞ্চয় ভেঙে, দাঁত চেপে বিল মেটালাম।
তাই সাফিয়া যখন জন্ম নিল, ডাক্তাররা যখন হৈচৈ শুরু করলেন, আমি সরাসরি গেলাম জাহাঙ্গির সাহেবের কাছে। উনি প্রেসক্রিপশনে লিখলেন—ভিটামিন ডি।
হাইরে ডাক্তার!
আজ ভোরে দুই মেয়ে ঘুমিয়ে আছে।
আমি নিউজফিড স্ক্রল করছি। হঠাৎ চোখে পড়ল—ফরিদপুরে নুরা পাগলা নামের এক লোকের লাশ কবর থেকে তুলে ফেলা হচ্ছে। মানুষের ভিড়, ছবি তোলা, হৈচৈ—সবই আছে। মনে হলো, মানুষ যেন আজকাল মৃত্যুকেও সার্কাস বানিয়ে ফেলেছে। মাথা ঝিম ধরে গেল। মনে পড়ে যায় উত্তরায় পুলিশের লাশ পোড়ানোর দৃশ্য।
একটা লাশের তো কিছু করার ক্ষমতা নেই। তবুও আমরা লাশ নিয়ে এভাবে হিংস্র হই কেন? আমরা জাতি হিসেবে দিন দিন অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি।
সকাল হলো। কোর্টের ভ্যাকেশন শুরু। সবাই ঘুরতে যাচ্ছে। আমি বসে আছি পড়ার টেবিলে। সামনে বই, মামলার ফাইল, আর মাথায় অদ্ভূত সব প্রশ্ন।
হাইরে কপাল!
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন