চট্টগ্রামে খোলা ড্রেন ও খাল: অব্যবস্থাপনার দায়ে ১৫টি প্রাণহানি
চট্টগ্রাম শহরের খোলা ড্রেন ও খালগুলোর কারণে ২০১৭ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত ১৫ জনের করুণ মৃত্যু হয়েছে। এ ধরনের দুর্ঘটনা কেবল দুঃখজনক নয়, বরং চরম প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রমাণও বটে। এই মৃত্যুগুলো প্রতিটি শহরবাসীর জীবনের নিরাপত্তা হরণের ইঙ্গিত দেয়।
প্রাণহানির তালিকা (২০১৭–২০২৫)
·
শীলব্রত বড়ুয়া (৬২) – ২ জুলাই ২০১৭, এমএম আলী রোডে ড্রেনে পড়ে গিয়ে মৃত্যু।
·
মো. আল আমিন (৭) – ৯ জুন ২০১৮, আমিন জুট মিল এলাকার ড্রেনে পড়ে মৃত্যু।
·
মো. সুলতান (৩৫) ও খাদিজা বেগম (৬৫) – ৩০ জুন ২০২১, চশমা খালে সিএনজি পড়ে যায়।
·
সালেহ আহমেদ – ২৫ আগস্ট ২০২১, চশমা খালে পড়ে নিখোঁজ, মরদেহ মেলেনি।
·
শেহেরিন মাহবুব সাদিয়া – ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, নাসির চারা খালে পড়ে মৃত্যু।
·
মো. কামাল উদ্দিন – ৬ ডিসেম্বর ২০২১, নাসির খালে পড়ে, তিন দিন পর মরদেহ উদ্ধার।
·
নিপা পালিত (২০) – ৭ আগস্ট ২০২৩, বৃষ্টির সময় ড্রেনে পড়ে যান।
·
ইয়াসিন আরাফাত (১.৫ বছর) – ২৭ আগস্ট ২০২৩, ড্রেনে পড়ে মৃত্যু।
·
আজিজুল হাকিম – ২৭ মে ২০২৪, কালাবাগিচা খালে পড়ে মারা যান।
·
সাইদুল ইসলাম (৭) – ৯ জুন ২০২৪, নাসির খালে পড়ে মৃত্যু।
·
অজ্ঞাত শিশু – ১১ জুন ২০২৪, চাক্তাই খালের ড্রেন থেকে নিখোঁজ, রাজাখালী খাল থেকে মরদেহ উদ্ধার।
·
সেহরিশ (৬ মাস) – ১৮ এপ্রিল ২০২৫, কাপাসগোলা এলাকায় রিকশাসহ ড্রেনে পড়ে মৃত্যু।
কর্তৃপক্ষের দায় ও অব্যবস্থাপনা
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (CCC) এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (CDA) নগরীর ড্রেন ও খাল ব্যবস্থাপনার জন্য যৌথভাবে দায়ী।
তবু তারা একে অপরকে দায়ী করে প্রকৃত জবাবদিহি এড়িয়ে যাচ্ছে। ২০১৭ সালে শুরু হওয়া জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় ৫,৬১৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও এখনো অধিকাংশ ড্রেন ও খাল খোলা। CCC ৫,৫২৭টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
আইনগত পদক্ষেপ ও দায়ীদের বিচার: রয়েছে কি কোনো অগ্রগতি?
এ পর্যন্ত কোনো দুর্ঘটনায় প্রশাসনিক বা ফৌজদারি আইনের আওতায় কাউকে জবাবদিহির মুখোমুখি করা হয়নি। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দরিদ্র ও অসহায় হওয়ায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস বা সুযোগ পায়নি। সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ এবং দণ্ডবিধির ৩০৪A ধারার প্রয়োগ হয়নি।
এছাড়া কোনো সুয়ো মোটো (suo motu) রুলও আদালত থেকে জারি হয়নি।
উপসংহার ও প্রস্তাবনা
চট্টগ্রামের ড্রেন-খাল-নদী ব্যবস্থাপনায় এই প্রাণহানির ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়—এটা একটি ধারাবাহিক অবহেলার ফল।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে ক্ষতিপূরণ, তদন্ত কমিটি গঠন এবং দোষীদের বিচারের আওতায় আনা।
আইনি হস্তক্ষেপ ও আদালতের তদারকি এখন সময়ের দাবি।“আইন যেখানে নেই, সেখানে প্রাণ নেই। এবং যেখানে প্রাণহানি ঘটে কিন্তু আইন কাজ করে না, সেখানে ন্যায়বিচার মৃত।”


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন