রিমান্ডের থিয়েটার: অতীত ও বর্তমান
নাম কী?
কাশেম।
ভালো নাম?
আবুল কাশেম।
আগে-পিছে কিছু নাই?
না স্যার, নাই।
আমাকে রিমান্ডে আনা হয়েছে। রিমান্ডের কথা এতদিন
কেবল কাগজে পড়েছি। কিন্তু বাস্তবে এর অভিজ্ঞতা যে এমন থ্রিলার মুভির মতো হবে, তা ভাবিনি।
তুই আব্রাহাম লিংকনকে খুন করেছিস?
জি স্যার, করেছি।
লিংকনকে খুন করার সাহস
পেলি কীভাবে?
স্যার, সাহস পাইনি। ওইদিন
একটু বেশি ভাত খেয়ে ফেলেছিলাম, মাথায় গরম উঠে গেছিল। তাই করে ফেলেছি।
কীভাবে করলি?
কীভাবে করেছি, এখন মনে নেই স্যার। একটু
ধরিয়ে দিলে বলতে
পারব। তবে খুন করেছি, এটা একশ পার্সেন্ট সত্য। মিথ্যা বলব না।
তাহলে বল, গলা টিপে
মেরেছিস?
এই তো মনে পড়েছে
স্যার! জি, গলা টিপেই মেরেছি। তবে উনি বেশ শক্ত
ছিলেন, সময় লেগেছিল।
উনার গরুটা কী করেছিস?
গরুর কথা মনে নেই স্যার। একটু ধরিয়ে
দেন।
গরুটা কেটে কুটে খেয়ে
ফেলেছিস?
জি স্যার। কেটে কুটে
খেয়েছি। তবে রান্নাটা রহিমা খালা করেছিল। উনি একটু বেশি
লবণ দিয়ে ফেলেছিলেন।
তোর খাওয়ার সময় কী মনে হচ্ছিল?
মনে হচ্ছিল, স্যার, খালাই পৃথিবীর সেরা শেফ। গরুর মাংসের স্বাদ ছিল অসাধারণ।
পুলিশের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে
গেল:
তুই এত কিছু করলি,
তাও তোর কোনো
অনুশোচনা নেই?
অনুশোচনা অবশ্যই আছে স্যার। লবণটা কম হলে ভালো হতো। আর রান্নাটা একটু বেশি নরম হলে আরও ভালো লাগত।
এক অফিসার চুপচাপ হাসছে।
তুই কীভাবে এমন গল্প
বানাস?
স্যার, গল্প নয়, এটা আমার জীবনের সত্যি
ঘটনা।
তোর জীবনের গল্পে কি কোনো সত্যি কথা আছে?
জি স্যার, সত্যি কথা একটাই—আপনারা চাইলে আমি আবার নতুন গল্প বানাতে পারি।
এই হলো রিমান্ডের থিয়েটার।
আসামি হয়ে ওঠে গল্পকার, আর পুলিশ হয়ে যায় শ্রোতা। সত্য-মিথ্যার এক অদ্ভুত মিশেলে তৈরি হয় নতুন নতুন কাহিনি।
সময়টা কেমন যেন পানসে।
টিভি খুললেই মনে হয়, খবরগুলো পুরোনো। কোনো উত্তেজনা নেই, নতুন কোনো গল্প নেই। ইউটিউবেও যেন একই দশা। পিনাকি দা আর ইলিয়াসের পুরোনো এপিসোডগুলো এমন গায়ে পড়ে সামনে আসে যে মনে হয়, "ভাই, নতুন কিছু না থাকলে আমরাই দেখো!"
মাঝে মাঝে ময়ুখের ক্ষেপাটে ভিডিওগুলোতে একটু রসদ মেলে। কিন্তু সেই পাগলাটাও যেন বিরতিতে। মনে হয়, কোনো যোগাসনের কোর্সে গিয়ে ধ্যান-জ্ঞান করছে।
আমরা যেন জীবনের একটা বড় অংশ হারিয়ে ফেলেছি। হারুনের ভাতের হোটেল নেই, নেই র্যাবের সেই নাটকীয় প্রেস ব্রিফিং। গল্প নেই, হাসি নেই।
আসামিরাও যেন বদলে গেছে। আগে তারা রিমান্ডে গিয়ে এমনভাবে সব স্বীকার করত, যেন পুরস্কার পাবে।
"হ্যাঁ স্যার, আমিই
করেছি। এই জায়গায় করেছি, এইভাবে করেছি।"
এখন? সবাই চুপ। না নতুন গল্প, না কোনো নাটক।
সবাই কি স্মার্ট হয়ে গেলো? নাকি আমরা
অতিরিক্ত নাটক দেখতে
দেখতে ক্লান্ত হয়ে গেছি?
কফি হাউজের সেই আড্ডাগুলোও যেন হারিয়ে গেছে। টেবিলের চায়ের কাপ ঠাণ্ডা, গল্পের থালা
শূন্য।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন